nature beauty

header ads

শিক্ষা-ঋণ ও আমার চিন্তা | Mohiuddin Kasemi

                      চিত্র:- খালেদ হাসান আরাফাত

শিক্ষা-ঋণ ও আমার চিন্তা
                             - মুহিউদ্দীন কাসেমী

ইমাম আবু ইউসুফ রহ. (মৃত্যু: ১৮২হি., ৭৯৮ খ্রি.)। পৃথিবীর ইতিহাসে একজন শ্রেষ্ঠ আইনবিদ। ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম চিফ জাস্টিস। পুরো দুনিয়ার আইনশাস্ত্র তাঁর কাছে ঋণী।

একবার ইমাম আবু ইউসুফ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে দেখার জন্য স্বয়ং ইমাম আবু হানিফা রহ. তাঁর বাড়িতে যান। পথিমধ্যে আবু হানিফা রহ. বলেন, ‘এ যদি মারা যায়, তাহলে দুনিয়ায় তাঁর চেয়ে বড় আর কোনো ফকীহ অবশিষ্ট থাকবে না।’

তাঁর মৃত্যুর পর সময়ের বাদশা হারুনুর রশীদ জানাযার ইমামতি করেন। তিনি মন্তব্য করেন : ‘তাঁর মৃত্যু গোটা মুসলিম জাহানের জন্য এমন শোকাবহ ঘটনা যে, একে অপরকে সমবেদনা জানানো উচিত।’

আবু ইউসুফ অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন। প্রিয় উস্তাদ আবু হানিফার কাছে ফিকহ শিখতে নিয়মিত হাজির হতেন। একদিন আবু ইউসুফের পিতা দরসগাহতে উপস্থিত হয়ে পুত্রকে নিয়ে যেতে চাইলেন। পড়ালেখার পরিবর্তে কাজকাম করলে কিছু উপার্জন হবে। অভাবের সংসারে একটু হলেও সহযোগিতা প্রয়োজন। দয়ালু উস্তাদ প্রিয় ছাত্রকে যেতে দিলেন না। কেবল আবু ইউসুফের পড়ালেখার খরচ দিতেন না, বরং তাঁর পরিবারের সমুদয় খরচও তিনি দিতেন। এরকম আরও অনেক ছাত্রের ব্যয়ভার ইমাম আবু হানিফা বহন করতেন। ছাত্রদেরকে অর্থদানকালে বলতেন : ‘আপনারা এসব নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করুন। আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে কৃতজ্ঞ হবেন না। আমি আপনাদেরকে আমার কাছ থেকে কিছুই দিইনি; বরং এসব আল্লাহর অনুগ্রহ। আপনাদেরকে দেওয়ার জন্যই তিনি আমাকে তা দিয়েছেন।’ (আল-খতীব, ত্রয়োদশ খ-, পৃ. ২৬০) ইমাম আবু হানিফা নিজের উপার্জিত সম্পদের বিপুল পরিমাণ আলেম-ওলামা ও তালিবুল ইলমদের পেছনে ব্যয় করতেন।

ইমাম আবু হানিফা রহ. আবু ইউসুফকে টাকা দিয়ে না পড়ালে হয়তো পৃথিবী বিচারপতি আবু ইউসুফকে পেত না। ইসলামী দুনিয়ায় আইনিশূন্যতা দূরীকরণে একজন আবু ইউসুফ পেতে হয়তো আরও কয়েক শতাব্দী লেগে যেত! সামান্য ক’টা টাকার জন্য ইসলামী দুনিয়া প্রথম কাজিউল কুজাত থেকে বঞ্চিত হতো!

.

ধনী-গরিব যে কেউ দীনি ইলম শিখতে পারে। ইমাম আবু হানিফা ও মুহাম্মদসহ আরও অনেক ইমাম ধনীর দুলাল ছিলেন। বিত্তের প্রাচুর্য তাদের চিত্তকে জ্ঞান আহরণে বাধা দিতে পারেনি। তবে বাস্তবতায় দেখা গেছে, ইলমওয়ালাদের অধিকাংশই গরিবঘরের সন্তান ছিলেন। আজও এর ব্যতিক্রম নয়।


আজকের দুনিয়া একাডেমিক শিক্ষার। ব্যক্তি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গৌরবের যুগ। একটি প্রতিষ্ঠান পারে যোগ্য আলেম তৈরি করতে। অনেক প্রতিভা টাকার অভাবে ঝড়ে পড়ে। প্রয়োজন তাদের সহযোগিতা করা। অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা হতে তাদেরকে মুক্ত রাখা। পৃথিবীর অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠান মেধাবীদের সহযোগিতা করছে, স্কলারশিপ দিচ্ছে। এর দ্বারা অনেকে উপকৃতও হচ্ছেন। ছাত্রদের জন্য আরেকটি জরুরি বিষয় হল, অভিভাবকত্ব ও দিক-নির্দেশনা। যুগ, ইসলাম ও নিজের প্রয়োজনে সাবজেক্ট নির্ধারণ করা এবং লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাওয়া। সঠিক নির্দেশনার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময়ী মুকুল অঙ্কুরেই ঝরে যায়। তাই এমন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন যেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের দুটো অভাবই পূরণ করা হবে।

আমার স্বপ্ন হল, এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে প্রবেশ করার আগপর্যন্ত তাদের যাবতীয় খরচ প্রতিষ্ঠান বহন করবে। প্রয়োজনে দেশ ও বিদেশের প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের খরচ-- এমনকি তার পরিবারের খরচও দেওয়া হবে। শিক্ষার্থী নির্বাচনে কিছু শর্ত থাকবে। শর্ত পাওয়া গেলেই কেবল নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হবে যে, তারা উপার্জন করার সক্ষমতা অর্জন করার পর উক্ত প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিবে। এ অঙ্গীকার আবশ্যকীয় নয়, নফল। সবাই দিবে না; শতকরা ৫০ ভাগ ছাত্র  তো দিবে। এটা দিয়েই প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যাবে- ইনশাল্লাহ। একজন দুজন নয়, কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে এমন সুযোগ দেওয়ার ইচ্ছে রয়েছে।

প্রশ্ন হয়, এত বিশাল খরচ দিবে কে? আল্লাহর মদত হলে অসম্ভব কিছুই নয়। আপাতত আল্লাহর এক বান্দা প্রতিমাসে বিরাট একটি অংক দিতে সম্মত হয়েছেন। তাঁর নাম গোপন থাক। তিনি নিরবে দান করতে পছন্দ করেন। তাঁর জন্য দোয়া চাই। এমন লোক আরও তৈরি হবে, ইনশাল্লাহ। একটি বিরাট পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্যও দোয়া করার সবিশেষ অনুরোধ রইল।

সব দীনি প্রতিষ্ঠানের উচিত ভদ্র ও চরিত্রবান হওয়ার শর্তে মেধাবীদের সার্বিক সহযোগিতা করা। শুধু অর্থবিত্ত নয় সার্বিক বিষয়ে সাহায্যের জন্যও হাত বাড়িয়ে দেওয়া চাই। তন্মধ্যে বুদ্ধি, সাহস, উৎসাহ, অনুপ্রেরণা, বিষয় নির্ধারণ ইত্যাদি অন্যতম। যেন মানসিক বিকাশেও কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকে।

Post a Comment

0 Comments