অভিনেতা ও বক্তা
- মুহিউদ্দীন কাসেমী
চিত্রকল্প : ০১
সিনেমার অভিনয় চলছে। নায়ক মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অভিনয় শেষ হওয়া মাত্র শুটিং স্পটেই সে মাদক সেবন করছে। এমনকি সিনেমার পরিচালক-প্রযোজক বা কর্তৃপক্ষের সামনে ও সাথেই মদপান করছে দেদারছে। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করল না যে, একটু আগেই তো আপনি মাদকতার বিরুদ্ধে বলেছেন; এখন নিজে মদপান করছেন কিভাবে?
এটা জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করে না কেউ। কারণ, সবাই জানে ওটা ছিল অভিনয়। অভিনয় ও বাস্তবের মাঝে বিস্তর ফারাক।
.
চিত্রকল্প : ০২
কোথাও মাহফিল হচ্ছে। প্রধান বক্তা ওয়াজ করছেন। বক্তা সাহেব নামাযের গুরুত্ব নিয়ে ওয়াজ করেন। মানুষ কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ। সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ওয়াজ শুনে। বক্তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ শ্রোতৃবৃন্দ। গভীর রাতে ওয়াজ শেষ। ওয়াজ শেষে সভাপতির বাড়িতেই বক্তা রাতযাপন করেন। সকালে ফজরের নামায পড়তে পারেননি। সকাল দশটায় উঠে নামায কাজা পড়েন। বিষয়টি সভাপতি ও আয়োজকবৃন্দের দৃষ্টি এড়ায়নি। আচ্ছা, তবুও কি আগামী বছর এ বক্তাকে দাওয়াত দিবেন না? দিবেন। কারণ, বক্তা মানে অভিনেতা। অভিনেতার মাঝে যেমন পরিচালক অভিনয়ের বিষয়ের বাস্তবতা খোঁজেন না; ওয়াজের আয়োজকবৃন্দও বক্তার মাঝে ওয়াজের বাস্তবায়ন দেখেন না। মানুষের সমাগমই মূল বিষয়।
.
জীবনে মাত্র একবার এফডিসিতে যাওয়ার সৌভাগ্য (!) হয়। কয়েক বছর আগে এক রমজানের কথা। মিরপুর জামেউল উলুম মাদরাসার হিফজ বিভাগের প্রধান হাফেজ শামছুল হক আমার বন্ধু মানুষ। খুলনায় বাড়ি। অস্বাভাবিক রসিক। আন্তরিক। কিছুদিন আগে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। সে ফোন করল, মুহিউদ্দীন ভাই কোথায়? বললাম ঢাকাতেই। বলল, জলদি এফডিসিতে আসেন। একটি বেসরকারি টিভিতে হাফেজদের কি যেন একটি প্রতিযোগিতা চলছিল। সে ছিল সহকারী বিচারক। প্রধান বিচারক ছিলেন বিখ্যাত এক সুরেলা বক্তা। নাম বললে সবাই চিনবে। বিকেল তিনটা বা সাড়ে তিনটার দিকে গেলাম। অনুষ্ঠান শুটিং হচ্ছে। একটু দূরে বসে আমরা দেখছিলাম। আসরের নামাযের সময় কোনো বিরতি হল না। আমি নামায পড়ে এসে দেখলাম শুটিং অব্যাহত। ইফতারের সামান্য আগে বিরতি দিল। শামছু ভাইকে বললাম, বিচারকগণ আসর পড়েনি। সে জানাল, এরা জোহরও পড়েনি!
.
সম্ভবত পৃথিবীর সব নাটক সিনেমাতেই অভিনেতা ও অভিনেত্রীকে সুন্দর চরিত্র দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। অথচ কর্তৃপক্ষ জানে যে, এ অভিনেতা-অভিনেত্রী বাস্তবে এ চরিত্রের অধিকারী নয়। তবুও তাকে দিয়ে অভিনয় করায়। কোনো এক ভারতীয় সিনেমায় অভিনেত্রী নিজেকে ‘কুমারী’ বলতে হয়েছিল চরিত্রের প্রয়োজনে। এটা নিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছিল; সংবাদটি পত্রিকায় যে দেখেছিলাম, মনে নেই এখন। বক্তাও তদ্রূপ। আয়োজকবৃন্দ মাহফিলে বেশি মানুষ সমাগমের চিন্তায় বক্তা দাওয়াত করে। বাস্তবে বক্তার মাঝে ওয়াজের বাস্তবায়ন আছে কিনা, এটা দেখে না। সুতরাং অভিনেতা ও বক্তার মাঝে বিরাট মিল রয়েছে।



0 Comments