nature beauty

header ads

কুরআন সহজ নাকি কঠিন? | Mohiuddin Kasemi


কুরআন সহজ নাকি কঠিন?
সবাইকে কুরআন পড়তে নিষেধ করা হয় কেন?
......................................... মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেমী

আমাদের দেশের আলেমসমাজ সাধারণ মানুষকে কুরআন পড়তে নিষেধ করেন। আলেমগণ বলেন কুরআন সবাই বুঝবে না। অথচ আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন :
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ
অর্থ : আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি; আছে কি কেউ উপদেশ গ্রহণকারী?! (সূরা কামর : ১৭)
এ বিষয়ে আরও আয়াত আছে। সূরা দুখান : ৫৮; সূরা মারয়াম : ৯৭।
এরকম স্পষ্ট আয়াত থাকার পরও কুরআন পড়তে নিষেধ করার কারণ বুঝে আসে না। এসব আলেম স্বার্থবাজ। মানুষকে কুরআন থেকে দূরে রাখতে চায়। সাধারণ মানুষ কুরআন বুঝে ফেললে তাঁদের পেটে লাত্থি পড়বে। এমন কথাও অনেক ভাই বলে থাকেন।
.
এবার আরেকটি আয়াত দেখুন :
وَتِلْكَ الأمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ وَمَا يَعْقِلُهَا إِلا الْعَالِمُونَ
অর্থ : আমি এসব উপমা মানুষের জন্য পেশ করে থাকি; যা কেবল আলেমগণ বুঝেন, অন্যরা বুঝে না। (সূরা আনকাবুত : ৪৩)।
কুরআনকে সহজ করার কথা কুরআনে আছে; আর কুরআন দুর্বোধ্য ও কঠিন হওয়ার কথাও তো কুরআনে আছে। একটি পেশ করবেন আরেকটি পেশ করবেন না, এমন দ্বিমুখী নীতি কেন?
.
মূল কথা হল, কুরআনে দু ধরনের আয়াত আছে। ক. সহজ। যেমন উপদেশ ও ঘটনা ইত্যাদি। খ. কঠিন ও দুর্বোধ্য। যেমন বিধিবিধান, বালাগাত-উপমা ইত্যাদি। সহজ বিষয়গুলো সবাই বুঝতে পারবে। কিন্তু কঠিন বিষয়গুলোর মর্ম উপলব্ধি করতে হলে ইলম থাকা দরকার। সুতরাং ঢালাওভাবে কুরআনকে সহজ বলা ঠিক না। এখন প্রশ্ন হয় তাহলে কুরআন অর্থ ও মর্মসহ পড়া যাবে না? হা, সাধারণ মানুষসহ সবাই পড়তে পারবে। পড়া উচিত। আল্লাহর কালামের মর্মই যদি না বুঝে তাহলে তার জীবনটাই বৃথা। তবে মনে রাখতে হবে, যেখানে বুঝবে না সেখানে আলেমদের শরণাপন্ন হবে। নিজে নিজে পড়ে মাতব্বরি করতে পারবে না। মনোমতো কোনো মর্ম উদঘাটন করবে না। তাঁদের জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে :
فَاسْأَلوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لا تَعْلَمُونَ
অর্থ : তোমরা কোনো জিনিস না জানলে যারা জানে তাঁদের কাছে জিজ্ঞেস করো। (সূরা নাহল : ৪৩)
.
সুতরাং যারা নিষেধ করেন, তাদের উদ্দেশ্য হল, সাধারণ মানুষ সহজ বিষয়গুলো পড়বে, কঠিনগুলো এড়িয়ে যাবে। হা, এগুলোও পড়তে পারবে, তবে না বুঝে আসলে আলেমদের কাছে জিজ্ঞেস করবে। কারণ, নিজে নিজে সিদ্ধান্তে উপনীত হলে ফিতনায় নিপতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যারা কুরআন-হাদিস পড়বে তাদেরকে এ মূলনীতি অবশ্যই বলে দিতে হবে। সরাসরি নিষেধ করা উদ্দেশ্য না, সতর্ক করা উদ্দেশ্য।
.
এবার উপরের দ্বিমুখী দুটি আয়াতের মর্ম দেখি।
কুরআনকে সহজ করার মর্ম সর্বক্ষেত্রে সহজ না। তাফসীরের কিতাবগুলো খুলে দেখলেই বাস্তবতা সামনে চলে আসে। একটি তাফসীর দেখি :
ولقد يسرنا القرآن للذكر :أي سهلناه للحفظ، وهيأناه للتذكير.
অর্থ : আমি কুরআনকে মুখস্থ করা ও উপদেশ গ্রহণ হিসেবে সহজ করেছি। (আয়সারুত তাফাসীর লিকালামিল আলিয়্যিল কাবির : খ.৫, পৃ. ২০৮) বোঝা গেল, কুরআন মুখস্থ ও উপদেশ গ্রহণ হিসেবে সহজ, সবক্ষেত্রে সহজ না।
আর কুরআনের কিছু আয়াত সবাই বুঝে না, কেবল আলেমগণ বুঝে। এ আয়াতের তাফসীর হল :
وما يعقلها إلا العالمون فيه إشارة إلى أن دقائق المعارف لا يعرفها إلا اصحاب الأحوال العالمون به تعالى وبصفاته وسائر شئونه سبحانه لأنهم علماء المنهج. روح المعاني - (২১ / ১৫)
.
কুরআনের গভীর জ্ঞান অর্জন করা ফরজে কিফায়া। ফরজে আইন না। তবে কুরআন হতে আহরিত বিধান যা বান্দার ওপর ফরজ, সেগুলো জানা ফরজে আইন। উদাহরণত কুরআনের অনেক জায়গায় নামাযের কথা এসেছে; এ আয়াতগুলোর মর্ম, অর্থ ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানা ফরজ না। বরং নামায শিখা ফরজ। তদ্রƒপ এতটুকু পরিমাণ সহিহ-শুদ্ধভাবে কুরআন তেলাওয়াত শিক্ষা করা ফরজে আইন যতটুকু দ্বারা নামায হয়ে যায়।
.
যত যাইহোক, সবাই কুরআন-হাদিস পড়বে। অহীর জ্ঞান হাসিল করবে। তবে উপরের মূলনীতি মনে রাখা আবশ্যক। কুরআন-হাদিসের যে-কোনো একটি আয়াত বা হাদিস নিয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে না। বরং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যত নস আছে সবগুলো একসাথে রেখে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া, যাতে সবগুলোর মাঝে সামঞ্জস্য হয়ে যায়। এটি একটি বড় মূলনীতি। সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সুতরাং কুরআন কেবল সহজ না, কঠিনও। দুনো আয়াত দেখুন।

(বি.দ্র. আলেম বলতে কেবল দাওরা বা কামিল পাশ করা বুঝায় না। আমাদের অনেক আলেম কুরআনের সংজ্ঞায় আলেম না। আবার অনেক গায়রে আলেমও ‘আলেম’ বিবেচিত হবেন। সেটি ভিন্ন বিষয়। প্রকৃত আলেমের সংজ্ঞা জানা উচিত। এ বিষয়ে লিখতে আগ্রহী; পরক্ষণেই ভাবি, আলেমের এ সংজ্ঞায় তো আমিও পড়ব না! এটা ভেবে নিবৃত্ত হই)

Post a Comment

0 Comments