nature beauty

header ads

সব হরতাল হারাম? | Mohiuddin Kasemi


সব হরতাল হারাম? একটি পর্যালোচনা
----------------------------------- মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেমী

মানুষকে অযথা কষ্ট দেওয়া শরীয়তে কঠোরভাবে নিষেধ। বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণিত। তবে শরীয়ত-অনুমোদিত স্থানে মানুষকে কষ্ট দেওয়া কোথাও বৈধ; আবার কোথাও আবশ্যক। 
.
সাধ্যমতো অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করা আবশ্যক। বিষয়টিও সুপ্রমাণিত। ব্যক্তির অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যেমন দরকার; প্রশাসনের অন্যায়ের মুখেও বুক চিত করে লড়াই-সংগ্রাম-প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। রাসুল সা. ইরশাদ করেন :
إِنَّ أَفْضَلَ الْجِهَادِ كَلِمَةُ حَقٍّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ
অর্থ : অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা উত্তম জিহাদ। (মুসনাদে আহমদ : খ.১৭, পৃ. ২২৮)
আরেক হাদিসে এসেছে :
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ
অর্থ : অন্যায় কাজ দেখলে সাধ্য থাকলে বন্ধ করবে; সাধ্য না থাকলে মুখে প্রতিবাদ করবে; এটারও সামর্থ্য না থাকলে মনে মনে ঘৃণা করবে। তবে এটা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৬)

প্রশ্ন হল প্রতিবাদ-সংগ্রাম-লড়াই করবে কিভাবে? স্থান-কাল ও পরিবেশ, আঞ্চলিক রীতিনীতি ও প্রচলন অনুযায়ী প্রতিবাদ-সংগ্রাম হবে। প্রতিবাদের নির্দিষ্ট কোনো ধরন শরীয়ত নির্দিষ্ট করে দেয়নি। এসব বিষয় শরীয়ত নির্ধারণ করে দেয়ও না। সামাজিক প্রচলনের ওপর ছেড়ে দেয়। সুতরাং আমাদের দেশে হরতাল প্রতিবাদের একটি ধরন। একটি রীতি। একটি মাধ্যম। এ রীতি অনুযায়ী অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করা যাবে।
প্রসঙ্গত অনেক ক্ষেত্রে উরফের কারণে নিষিদ্ধ কাজ বৈধতা পায়। কিংবা মুতলাককে মুকায়য়াদ করা হয়। কেবল একটি উদাহরণ দিচ্ছি :
অধুনা ফ্রিজ, কিম্পউটার, ল্যাপটপ, মোটর, সাবমারসিবল, গাড়ি, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন পণ্য নির্দিষ্ট সময়ের ওয়ার‌্যান্টি বা গ্যারান্টি দিয়ে বিক্রি হচ্ছে। এ সময়ের ভেতর নষ্ট হলে ফেরত নিয়ে নতুন পণ্য দিবে কিংবা এটাই মেরামত করে দিবে। এ ধরনের শর্তযুক্ত কেনাবেচা নাজায়েয হওয়ার কথা ছিল। কারণ, সরাসরি হাদীসে আছে :
نَهَى عَنْ بَيْعٍ وَشَرْطٍ
অর্থ : রাসূল সা. কেনাবেচা ও শর্ত একত্রিত করতে নিষেধ করেছেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা : খ.১৪, পৃ. ২৭৫।) অর্থাৎ কেনাবেচার সাথে অন্য কোনো শর্ত উল্লেখ করা যাবে না। এ হাদীসে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উরফ বা সামাজিক প্রচলনের কারণে গ্যারান্টি ও ওয়ার‌্যান্টিযুক্ত কেনাবেচা করা জায়েয।
বিশেষ দ্রষ্টব্য : উরফ বা সামাজিক প্রচলন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে উসুলুল ফিকহের কিতাবসমূহ দেখতে হবে। এর পরিচয় ও শর্তাবলি জেনে আমল করা লাগবে।
.
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, হরতালের কারণে তো সাধারণ মানুষের কষ্ট হচ্ছে। যে অন্যায় করেছে তার বিরুদ্ধে হরতাল-সংগ্রাম করা যায়, তাকে কষ্ট দেওয়া যায়; কিন্তু যে বা যারা অন্যায় করেনি তাদেরকে কষ্ট দেওয়া কতটুকু বৈধ?
এর উত্তর জানার আগে আমরা দুটি উদাহরণ পেশ করছি। জনগণের প্রয়োজনে একটি রাস্তা করা দরকার। কিন্তু রাস্তা করতে হলে কয়েকজনের বাড়ি ভাঙতে হয়। এখন শক্তি খাটিয়ে এদের বাড়ি ভাঙা জায়েয হবে? উত্তর হল, জায়েয। তদ্রূপ যে কোনো পণ্য কিনে গুদামজাত করা জায়েয। তার যখন ইচ্ছ তখন বিক্রি করবে। বিক্রি করতে কেউ তাকে বাধ্য করতে পারবে না। কিন্তু যখন দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং ওই পণ্যের আবশ্যিকতা তীব্র হয়, তখন সরকার তাকে ওই পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করতে পারবে। ফুকাহায়ে কেরাম এসব মাসআলা এ মূলনীতির আলোকে উল্লেখ করেছেন :
يُدفعُ الضَّررُ العامُّ بتحمُّل الضَّررِ الخاصِّ
(তাইসীরু ইলমি উসুলিল ফিকহ : খ.৩, পৃ. ৬৩)
সুতরাং সর্বসাধারণে প্রয়োজনে, সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকদের অধিকার আদায়ে হরতাল দিলে যদিও কিছু মানুষের কষ্ট হয়, বৈধ হবে। কারণ, যাদের দাবি তাদের তুলনায় হরতালে ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা কম।
.
কুরআন ও হাদিস থেকে কোনো বিধান আহরণ করতে হলে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, মুজতাহিদ ইমামবর্গ এবং সমসাময়িক বিজ্ঞ ওলামাদের নির্দেশনা আবশ্যক। উদাহরণত ইঞ্জেকশন গ্রহণ করলে রোযা ভাঙবে কিনা, এই বিধান আমরা কোথায় পাবো? সমসাময়িক মুজতাহিদতুল্য আলেমগণের মতের ওপর আমল করতে হয়। আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে ওলামায়ে কেরাম বিভিন্ন ইস্যুতে হরতাল দিয়েছেন। রাজনৈতিক অরাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে। তসলিমা নাসরিন, ফতোয়াবিরোধী রায় ও সর্বশেষ নাস্তিক-ব্লগারদের ইস্যুতে এদেশের আপমার আলেমসমাজ ও সাধারণ মুসলিমগণ হরতাল অবরোধ দিয়েছেন। এগুলো কি হারাম? কিংবা অন্তত নাজায়েয? হেফাজতের অবরোধ নাজায়েয ছিল? ইখওয়ানের আন্দোলন-অবরোধ বা রাস্তায় অবস্থান অবৈধ?
.
এটা ঠিক যে, হরতালে গাড়ি ভাঙা, আগুন দেওয়া, মানুষের ক্ষতি করা-- এসব কাজ ইসলামে কঠোর নিষেধ। আমার বলার উদ্দেশ্য, প্রতিবাদের একটি মাধ্যম হিসেবে হরতাল নাজায়েয না; হারাম হওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না।
কারা কী উদ্দেশ্যে হরতাল দিল এটা তাদের বিষয়। আমি বলতে চাচ্ছি, ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং জুলুম-অন্যায়ের প্রতিবাদ হিসেবে হরতাল হারাম হয় কিভাবে?  
.
‘শরীয়তে নিষিদ্ধ কাজের সর্বোচ্চ স্তর হল ‘হারাম’। কোনো কাজ হারাম হওয়ার জন্য দুটো বিষয় পাওয়া জরুরি : ১. قطعي الدلالة : উদ্দিষ্ট অর্থেই নির্দিষ্ট হতে হবে; ২. قطعي الثبوت এবং অকাট্যভাবে প্রমাণিত হবে। আর ‘নাজায়েয’ হারামের পরের স্তর। নাজায়েয ও মাকরুহে তাহরীমী একই স্তরের।
...
বিষয়টি আরও বিস্তারিত পর্যালোচনার দাবি রাখে। এ সম্পর্কে উসুল ও মাকাসেদে শরীয়াহ সম্পর্কে জ্ঞাত বিজ্ঞ কোনো আলেম বা দারুল ইফতার কোনো গবেষণা-প্রবন্ধ থাকলে উপকৃত হতে চাই। আমার এ সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ কারও প্রতি বিদ্বেষ বা ভালোবাসার কারণে নয়। নিছক ইলমী তাহকীক। যৌক্তিক ও দালিলিক আলোচনা-সমালোচনাকে সাধুবাদ জানাই। শুধু তক্কাতক্কি করার জন্য ইলম শেখা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ। নিচের হাদিসটি সবসময় আমার মনে থাকে :
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُجَارِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ أَوْ لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ أَدْخَلَهُ اللَّهُ النَّارَ
তিরমিযি, হাদিস : ২৬৫৪

Post a Comment

0 Comments