তকদির ও তদ্বির
                         মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেমী

একই পিতা-মাতার সব সন্তান একরকম হয় না। কেউ কালা, কেউ ধলা। কেউ মোটা, কেউ চিকন। তদ্রƒপ কেউ মেধাবী, কেউ গাধা। সবাই একই খাবার খাচ্ছে। তবুও সকলের মেধা একরকম না। শারীরিক গঠন ও মানসিক বিকাশ-- কোনো ক্ষেত্রেই কেউ কারও সঙ্গে তুলনীয় নয়। এমন হয় কেন? সোজা উত্তর, তকদির এভাবেই লেখা। ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। ললাটের লিখন কখনো যায় না খ-ন!
এক শ্রমিক পঞ্চম তলায় কাজ করছে। হঠাৎ পা পিছলে নিচে পড়ে গেছে। নির্মাণাধীন ভবনের নিচে ছিল বালুর স্তূপ। পড়ল সোজা বালির ওপর। নির্ঘাত মৃত্যু থেকে বাঁচল। সবাই ধরল শুকরিয়াস্বরূপ মিষ্টি খাওয়াও। নতুন জীবনে ফিরে পাওয়ার আনন্দে সে মিষ্টি আনতে গেল। রোড পার হওয়ার সময় ট্রাকের ধাক্কায় জায়গাতেই মৃত্যুবরণ করল। মিষ্টি আর খাওয়ানো হল না। এমনটি হল কেন? এটাই তকদির।
.
কুরআন-হাদিসে দুই ধরনের বক্তব্য আছে। এক ধরনের বক্তব্য দিয়ে বোঝা যায়, তকদিরে যা আছে তাই হবে। বিন্দুমাত্র হেরফের হওয়ার সুযোগ নাই। দুনিয়া সৃষ্টির হাজার হাজার বছর আগে এ দুনিয়ায় কী ঘটবে না ঘটবে সবই তিনি ভাগ্যলিপিতে লিখে রেখেছেন। নাটক লেখা শেষ। এবার মঞ্চায়নের পালা। চিত্রনাট্য অনুযায়ী নাটক মঞ্চায়িত হবে, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। দুয়েকটি আয়াত ও হাদিস দেখা যাক :
وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ قَدَراً مَّقْدُوراً
(সূরা আহযাব : ৩৮)
وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولاً
(সূরা আহযাব : ৩৮)
وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ
(সূরা ইউনুস : ১০৭)
قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا هُوَ مَوْلانَا
অর্থ : আপনি বলে দিন, আল্লাহ আমাদেও ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন, এর বাইওে কিছুই হবে না। তিনিই আমাদের কার্যনির্বাহক। (সূরা তাওবা : ৫১)
 মাত্র একটি হাদিস দেখব :
وَاعْلَمْ أَنَّ الْأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ، لَمْ يَكْتُبْهُ اللهُ لَكَ لَمْ يَقْدِرُوا عَلَى ذَلِكَ، وَلَوِ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ، لَمْ يَكْتُبْهُ اللهُ عَلَيْكَ لَمْ يَقْدِرُوا عَلَى ذَلِكَ، قُضِيَ الْقَضَاءُ وَجَفَّتِ الْأَقْلَامُ، وَطُوِيَتِ الصُّحُفُ
অর্থ : সকল সৃষ্টজীব মিলেও আপনার উপকার করতে চাইলে পারবে না, যদি সেটা আপনার ভাগ্যে আল্লাহ না লিখে রাখেন। তদ্রƒপ এমন কোনো ক্ষতিও করতে পারবে না, যদি সেটা আপনার ভাগ্যে না থাকে। সবকিছু ফয়সালা হয়ে গেছে। ভাগ্যলিপি লেখার কলমের কালি শুকিয়ে গেছে। ভাগ্যলিপি লেখার খাতা ভাজ করে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নতুনভাবে আর কিছু লেখা হবে না। (শুআবুল ইমান, হাদিস : ১৯২)
.
এর বিপরীতে কিছু আয়াত ও হাদিস রয়েছে :
إِنَّ اللَّهَ لا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ
অর্থ : নিজেরা ভাগ্য পরিবর্তন না করলে আল্লাহ তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করেন না। (সূরা রা’দ : ১১)
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
অর্থ : যারা আমার রাস্তায় চেষ্টা করে তাদেরকে আমি অবশ্যই হেদায়াত দেবো। (সূরা আনকাবুত : ৬৯)
রাসুল সা. বলেন :
الصَّدَقَةُ تُطْفِئُ غَضَبَ الرَّبِّ
অর্থ : দান-সদকা করলে আল্লাহর ক্রোধ দূর হয়। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৩৩০৯)
আরও অনেক হাদিসে আছে, দানখয়রাত করলে বালা-মুসিবত দূর হয়।
.
দুই ধরনের বক্তব্য পেলাম আমরা। একটিকে গ্রহণ করলে অপরটিকে প্রত্যাখ্যান করতে হয়। একজন রোগীকে আপনি ওষুধ খেতে বলার পর সে বলল, তকদিরে যা আছে তা-ই হবে। তকদিরে সুস্থতা না থাকলে পৃথিবীর সব ওষুধ তাকে খাইয়ে দিলেও সে সুস্থ হবে না। দুই ধরনের বক্তব্যেও মাঝে সামঞ্জস্য সাধন করাই মূল নিয়ম। উভয় কূল রক্ষা পাবে। কারণ, একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি গ্রহণ করা যাবে না। উত্তম সামঞ্জস্য হল, কাজ করার আগে চেষ্টা-তদ্বির। কাজ হওয়ার পর তকদির। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করতে হবে। চেষ্টার পর যা ঘটবে এটাই তকদির। তকদির দু ধরনের হতে পারে। যেমন চেষ্টা না করলে এক ধরনের রেজাল্ট হবে, আর চেষ্টা করলে আরেক ধরনের রেজাল্ট হবে। আবার কিছু তকদির আছে যা কষনও পরিবর্তন হয় না। এটাকে ‘মুবরাম’ বলে। আর পরিবর্তনশীল তকদিরকে ‘মুআল্লাক’ বলা হয়।

বিচক্ষণ সাহাবি ওমর রা. এর শাসনকাল চলছে। সেনাবাহিনী যুদ্ধে গেল। তাদের মাঝে মহামারি ছড়িয়ে পড়ল। বেশকিছু সাহাবি ইন্তেকাল করেন। খলিফা ওমর রা. দ্রুত ঘঁনাস্থলে গিয়ে সবাইকে বললেন, এখান থেকে সামনে চলো। বিখ্যাত সাহাবি আবু উবায়দা রা. বললেন : أفِراراً مِنْ قَدَرِ الله ؟ ‘ধামরা কি আল্লাহর তকদির হতে পলায়ন করছি? ওমর রা. বললেন, তোমার মতো মানুষ এমন প্রশ্ন করলে! শোনো : نَفِرُّ مِنْ قَدَرِ اللهِ إلى قَدَرِ اللهِ ‘আমরা আল্লাহর এক তকদির হতে অপর তকদিরের দিকে ফিরে যাচ্ছি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৩৯৭)
প্রসঙ্গত শরীয়তের যে কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করা এবং সঠিক মর্ম উদঘাটনে একই বিষয়ে পরস্পরবিরোধী থাকলে সবগুলো সামনে রাখা আবশ্যক; যেন সামঞ্জস্য করা যায়। একটিকে বাদ দিয়ে অপরটি গ্রহণ করা ভুল।
তকদির অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। এ বিষয়ে অতিরিক্ত ঘাঁটাঘাঁটি করা নিষেধ। তকদির বিষয়ে বাড়াবাড়ি করতে গিয়েই অনেক ভ্রান্ত দল-উপদলের উদ্ভব হয়েছে। তকদিরের মতো গোপন ও নাযুক কোনো বিষয় নেই। ইমাম তাহাবী তাঁর আকিদার কিতাবে লেখেছেন :
‘তকদির একটি গোপন রহস্যময় জিনিস। কোনো মাখলুক এমনকি নৈকট্যপ্রাপ্ত নবী-রাসুল ও ফেরেশতাদের কেউ এ বিষয়ে সম্যক অবগত নয়। তকদির বিষয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে অপমানিত হতে হবে। তকদিরের বিষয়টি আল্লাহ তাআলা কাউকে জানাননি। (আকিদাতুত তাহাবী : ১, পৃ. ৩২)
সুতরাং এক কথায় আমরা বলতে পারি : আমরা তকদিরেও বিশ্বাস করি তদ্রুপ তদ্বিরও করতে হবে। একটাকে বাদ দিয়ে অপরটি গ্রহণ করা অন্যায় ও মূর্খতা বৈ কিছু নয়।