শুধু বাহ্যিক হাদিস দেখেই ফয়সালা করা যায় না
প্রসঙ্গ কুকুর বেচাকেনা
মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেমী
অনেক সময় বাহ্যিক হাদিস দেখে ফয়সালা করা যায় না। হাদিসকে সামনে রেখে ইমামগণ বিভিন্ন মত পেশ করেন। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে কোনো কোনো মত শক্তিশালী হয়ে যায়। কারণ, তীব্র প্রয়োজন, বাস্তবতা ও সামাজিক প্রচলন বিবেচনা করে বিধানেও পরিবর্তন আসে। উদাহরণত একটি মাসআলা নিয়ে আলোচনা করব :
عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ الْأَنْصَارِيِّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ ثَمَنِ الْكَلْبِ وَمَهْرِ الْبَغِيِّ وَحُلْوَانِ الْكَاهِنِ
يَعْنِي بِمَهْرِ الْبَغِيِّ مَا تُعْطَاهُ الْمَرْأَةُ عَلَى الزِّنَا وَحُلْوَانُ الْكَاهِنِ رَشْوَتُهُ وَمَا يُعْطَى عَلَى أَنْ يَتَكَهَّنَ
অর্থ : হযরত আবু মাসউদ আনসারী রা. হতে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুরের মূল্য, ব্যভিচারের বিনিময় ও জ্যোতিষের টাকা-পয়সা গ্রহণ করা নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ এসবের বিনিময় নেওয়া নিষিদ্ধ। (মুআত্তা মালেক : খ. ২, পৃ. ৬৫৬; হাদীসের মান : সহীহ)
.
পাহারা দেওয়া, শিকার করা ইত্যাদি কাজে কুকুরের ব্যবহার শরীয়তে অনুমোদিত। এতে কোনো মতানৈক্য নেই। কিন্তু কুকুর বেচাকেনার ইসলামে বৈধ কিনা? এ বিষয়ে হাদিসে স্পষ্ট নিষেধ করা হয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞা হারাম, নাজায়েয়, মাকরুহ নাকি মুবাহ বা বৈধ হলেও অনুত্তম? এ বিষয়ে ফকিহগণ বিভিন্ন মত পেশ করেছেন।
শাফেয়ী ও হাম্বলীদের মতে, সবধরনের কুকুর বেচাকেনা করা নাজায়েয। প্রশিক্ষিত হোক বা না হোক; সংগ্রহ ও পালন করা জায়েয হোক বা নাজায়েয। কোনো কুকুরই বেচাকেনা করা বৈধ নয়। কারণ, কুকুরের বেচাকেনা সম্পর্কে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে হাদীসে। উপরন্তু কুকুর নাপাক। আর নাপাক জিনিস বেচাকেনা করাও নাজায়েয। (কিতাবুল উম্ম : খ. ৩, পৃ. ১১)
قَالَ مَالِك أَكْرَهُ ثَمَنَ الْكَلْبِ الضَّارِي وَغَيْرِ الضَّارِي لِنَهْيِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ ثَمَنِ الْكَلْبِ
ইমাম মালেক রহ. বলেন, কুকুর বিক্রি করা মাকরুহ মনে করি-- চাই ওই কুকুর মানুষের ক্ষতি করুক কিংবা ক্ষতি না করুক। কারণ, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুরের মূল্য গ্রহণ করতে বারণ করেছেন। নিষেধাজ্ঞাটি ব্যাপক।
হানাফী এবং মালেকী মাযহাবের ইমাম সাহনুনের মতে সব ধরনের কুকুর বেচাকেনা করা জায়েয। তবে একটি দুর্বল বর্ণনামতে ইমাম আবু ইউসুফ ইমাম আবু হানিফার অভিমত বর্ণনা করেন, বিষাক্ত ও পাগলা কুকুর-- যা কোনো উপকারে আসে না, কেবল মানুষকে কামড়ায়- বিক্রি করা নাজায়েয। যেসব হাদীসের কুকুর বেচাকেনা নিষেধ করা হয়েছে এগুলোর উত্তর দিয়েছেন ইমাম কাসানী রহ.। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল। কারণ, তারা কুকুর সংগ্রহ ও পরিপালনে ভীষণ আগ্রহী ছিল। তাই কুকুর হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং কুকুরের প্রতি ঘৃণা জন্মানোর উদ্দেশ্যে বেচাকেনাও নিষেধ করা হয়। (এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে দেখা যেতে পারে : বাদায়েউস সানায়ে : খ. ৪, পৃ. ৩৩৩; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী : খ. ২, পৃ. ১৩৮; আশ-শারহুল কাবীর বিহাশিয়াতিত দুসুকী : খ. ৩, পৃ. ১১; শারহুল মিনহাজ বিহাশিয়াতিল জামাল : খ. ৩, পৃ. ২২; আল-মুগনী : খ. ৪, পৃ. ১৮৯; আল-মাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ : খ. ৩৫, পৃ. ১২৭, ভুক্তি : كَلْب)
.
বর্তমান যুগে কুকুর বিক্রি করা নাজায়েয, এ কথা বাস্তবসম্মত না। ডগ স্কোয়াড নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাসা-বাড়ি, ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পাহারা দেওয়ার ক্ষেত্রে কুকুরের ভূমিকা অনস্বীকার্য ও স্বীকৃত। এখন বাহ্যিক হাদিসের দিকে তাকিয়ে কুকুর বিক্রি করাকে নাজায়েয বলা যায় না। তাই যেসব ইমামগণ কুকুর বিক্রি করা বৈধ ও মাকরুহ বলেছেন তাঁদের মত গ্রহণ করতে হবে। পুরো পৃথিবীই বৈধতার মত গ্রহণ করেছে।
এমন আরও অনেক মাসআলা আছে, যেখানে বাহ্যিক হাদিসের ওপর আমল করা যায় না। অন্যান্য দলিল, যুক্তি, উরফ-সামাজিক প্রচলন, তীব্র প্রয়োজন ইত্যাদি বিষয় সামনে রেখে ফয়সালা দিতে হয়।



0 Comments