ওয়াজ-মাহফিল : ০৫
____________________ মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেমী
ওয়াজ মাহফিলে বক্তা নির্দিষ্ট করা অনুচিত!
ওয়াজ মাহফিলগুলোতে বক্তাদের নাম পূর্ব থেকেই ঘোষণা করা হয়ে থাকে। কাক্সিক্ষত বক্তার নাম শুনলে মানুষ সেখানে যায়। পছন্দমতো বক্তা না হলে মানুষের উপস্থিতি কম হয় বা হয়ই না। আমাদের দেশে সুরেলা ও আওয়াজধারী বক্তাদের জয়জয়াকার। যেন ওয়াজ নয়, আওয়াজই মুখ্য বিষয়।
ওয়াজ করা ও শোনা একটি ইবাদত। কুরআনও উপদেশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু ওয়াজ মাহফিলে বক্তার নাম নির্দিষ্ট করে দেওয়া অনুচিত, অনাকাক্সিক্ষত ও অযাচিত। অবৈধ ও হারাম বলার দুঃসাহস দেখাতে পারছি না; তবে কাজটি যে ইসলামে পছন্দ নয় এবং সাহাবিদের কর্মপন্থার বিপরীত তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সাহাবায়ে কেরামের কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করা দীনের বিধান, রাসুলের নির্দেশ। আর সে কর্মপন্থা যদি হযরত উমর রা. এর মতো প্রজ্ঞাবান সাহাবির বাতলানো হয়, তাহলে তো এর ভেতর আরও অজানা অনেক হিকমত ও রহস্য লুকিয়ে থাকতেই পারে।
সকলের স্মরণ থাকার কথা। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে সেনাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। কারণ, মানুষ মনে করে বসতে পারে যে, বিজয় কেবল খালিদের কারণেই আসছে! অথচ বিজয় একমাত্র আল্লাহর দান ও অনুদান। সেখানে মানুষের কোনো হাত নেই। আকিদাগত বিভ্রান্তির কারণেই তাকে অপসারণ করেন। চিন্তার করুন, যারা খায়রুল কুরুনের লোক, যারা রাসুল সা. ও সাহাবিদের সান্নিধ্যপ্রাপ্ত তাদের ব্যাপারে হযরত উমর এমন আশঙ্কা করছেন!
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. নিজেই বলেছেন :
لأعزلن خالد بن الوليد والمثنى مثنى بني شيبان حتى يعلما أن الله إنما كان ينصر عباده وليس إياهما كان ينصر
আমি অবশ্যই খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এবং মুছান্না বনী শায়বানকে অব্যাহতি দেব। যেন তারা অবগত হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের সাহায্য করে থাকেন; কেবল তাঁদের দুজনকেই করেন না। [আততাবাকাতুল কুবরা : খ. ৩, পৃ. ২৮৪]
ইবনে জারীর তাবারী বলেন :
عن عدىّ بن سهيل، قال: كتب عمر إلى الأمصار: إني لم أعزل خالدا عن سخطة ولا خيانة، ولكنّ الناس فتنوا به، فخفت أن يوكّلوا إليه ويبتلوا به، فأحببت أن يعلموا أنّ الله هو الصانع، وألا يكونوا بعرض فتنة.
আদী ইবনে সুহাইল থেকে বর্ণনা করেন, হযরত উমর রা. বিভিন্ন শহরের দায়িত্বশীলদের কাছে এ মর্মে সংবাদ প্রেরণ করেন যে, “আমি খালিদকে ক্রোধ ও খেয়ানতের কারণে অপসারণ করিনি। তবে মানুষ তার কারণে ফেতনায় নিপতিত হয়েছে। তাই আমি ভয় পেলাম অবশেষে মানুষজন তার ওপর ভরসা করা শুরু করবে এবং তার কারণে পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। সেহেতু আমি পছন্দ করলাম খালিদকে অপসারণ করার মাধ্যমে মানুষ যেন জানতে পারে যে, একমাত্র আল্লাহ-ই সবকিছু করার ক্ষমতা রাখেন, অন্য কেউ না। এবং জনসাধারণ তার কারণে ফেতনার সম্মুখীন হবে না। [তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক : খ. ৪, পৃ. ২৮২-২৮৩]
সুতরাং উমর রা. যখন দেখলেন খালিদের নেতৃত্বে অস্বাভাবিক বিজয়ের কারণে মানুষের আকীদা ও বিশ্বাস খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তারা খালিদের ব্যক্তিত্ব ও সাধুতাকেই বিজয়ের একমাত্র কারণ ভাবছে। সুতরাং হযরত খালিদের হাতে অর্জিত বিজয়কে প্রকৃত দাতা আল্লাহর দিকে সম্পর্কযুক্ত করা পরিপূর্ণ তাওহীদের পরিপন্থী। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে :
وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ
‘সাহায্য কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে; যিনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।’ [সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১২৬।]
আর এ পরিপূর্ণ তাওহীদকে জীবনব্যাপী মানুষের অন্তরে কেন্দ্রীভূত করা ও অব্যাহত রাখাই ইসলামের কামনা। যাতে নবসৃষ্ট কোনো বিষয় তার অন্তরে প্রভাব সৃষ্টি করতে না পারে।
এবার আসুন ওয়াজ মাহফিলের দিকে তাকাই। ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার পরিবর্তে বক্তার প্রতিই আকৃষ্ট হচ্ছে শ্রোতারা। মানুষ মনে করছে, অমুক বক্তা আসলে হেদায়াত পাওয়া যাবে! অমুকের কথায় হিন্দুও মুসলমান হয়ে যায়। সুতরাং হযরত উমর রা. এর এ ঘটনা থেকে আমরা অনুমান করতে পারি যে, ওয়াজ মাহফিলে নির্দিষ্ট বক্তার নাম বলা ও প্রচার করা ঠিক নয়। শুধু এতটুকু বললেই হয় যে, অমুক স্থানে এতটার সময় ওয়াজ হবে, আপনার আমন্ত্রিত। দীনের প্রতি আগ্রহ থাকলে মানুষ আসবে। আর মানুষ না আসলে কিংবা কম আসলেও কোনো সমস্যা নেই; মানুষের উপস্থিতি বেশি দেখানোই তো মুখ্য বিষয় নয়। হেদায়াত মূল হয়। কোথাও মাহফিল করার পর যদি সেখানের মানুষ নামাযি হয়, মেয়েরা পর্দানশীন হয়, শিরক-বিদআত হ্রাস পায়, ঝগড়া-বিবাদ কমে যায়, মানুষ দীনের প্রতি আকৃষ্ট হয়- তাহলে বুঝতে হবে ওয়াজ করানো সার্থক হয়েছে।
হযরত উমর রা. এর ঘটনার সাথে ওয়াজ মাহফিলের বক্তাকে কিয়াস করা কি কিয়াস মাআল ফারেক? অযৌক্তিক?



0 Comments